প্রশ্ন: ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (Virtual Reality) কী? প্রাত্যহিক জীবনে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রভাব বর্ণনা করো।


ভিডিও কার্টেসি: Systech Publications


ভাচুর্য়াল রিয়েলিটি: প্রকৃত অর্থে বাস্তব নয় কিন্তু বাস্তবের চেতনার উদ্যোগকারী বিজ্ঞাননির্ভর কল্পনাকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বা কল্পবাস্তবতা বলে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হচ্ছে কম্পিউটারনিয়ন্ত্রিত সিস্টেম, যাতে মডেলিং ও অনুকরণবিদ্যা প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ কৃত্রিম ত্রিমাত্রিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন বা উপলব্ধি করতে পারে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে অনুকরণকৃত পরিবেশ হুবহু বাস্তব পৃথিবীর মতো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় ভার্চুয়াল রিয়েলিটি থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় অনুকরণকৃত বা সিম্যুলেটেড পরিবেশ বাস্তব থেকে আলাদা হতে পারে। যেমন: ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেমস। এতে ত্রিমাত্রিক ইমেজ তৈরির মাধ্যমে অতি অসম্ভব কাজও করা সম্ভব হয়।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে বাস্তব অনুভব করার জন্য তথ্য আদান প্রদানকারী বিভিন্ন ধরণের ডিভাইস যেমন- মাথায় হেড মাউন্টেড ডিসপ্লে (Head Mounted Display), হাতে একটি ডেটা গ্লোভ (Data Glove), শরীরে একটি পূর্ণাঙ্গ বডি স্যুইট (Body Suit) ইত্যাদি পরিধান করতে হয়।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সিস্টেম তৈরির উপাদান সমুহ:

১। ইফেক্টর: ইফেক্টর হলো বিশেষ ধরণের ইন্টারফেস ডিভাইস যা ভার্চুয়াল রিয়েলিটি পরিবেশের সাথে সংযোগ সাধন করে। যেমন- হেড মাউন্টেড ডিসপ্লে।

২। রিয়েলিটি সিমুলেটর: এটি এক ধরণের হার্ডওয়্যার যা ইফেক্টরকে সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহ করে। যেমন- বিভিন্ন ধরণের সেন্সর।

৩। অ্যাপ্লিকেশন: বিভিন্ন সিমুলেশন সফটওয়্যার সমূহ। যেমন- অটোডেস্কের “Division”

৪। জিওমেট্টি: জিওমেট্রি হলো ভার্চুয়াল পরিবেশের বিভিন্ন বস্তুর বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত তথ্যাবলী।

প্রাত্যহিক জীবনে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রভাব: ভবিষ্যতে যখন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অনেক বেশি সহজলভ্য হয়ে যাবে, তখন তা বিনোদন থেকে শুরু করে যোগাযোগ পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যবহত হবে। বিভিন্ন পেশা ও গবেষণায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রয়োগের ফলে সমাজে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।

১. ইতিবাচক প্রভাব

ক) চিকিৎসাক্ষেত্রে: উন্নত বিশ্বে ডাক্তারদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদানে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহূত হচ্ছে। বর্তমানে সার্জিক্যাল প্রশিক্ষণে এসআইএসটি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ল্যাবরোস্কোপিক প্রশিক্ষণ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এই পদ্ধতিতে কম্পিউটার সিম্যুলেশন ব্যবহার করে ল্যাবরোস্কোপিক পরিচালনার বিভিন্ন কৌশল শেখানো হয়। শিক্ষানবিশ ডাক্তাররা এর ফলে অন্তত সহজে ও সুবিধাজনক উপায়ে বাস্তবে অপারেশন থিয়েটারে  কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ভার্চুয়াল অপারেটিং কক্ষে ছাত্ররা কৌশলগত দক্ষতা, অপারেশন এবং রোগসম্পর্কিত তাত্ত্বিক বিষয়াদির কার্যাবলি অনুশীলন করতে সক্ষম হন।

খ) ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে: ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে আজকাল ড্রাইভিং শেখানো হচ্ছে। স্বল্প মুল্যের মাইক্রো কম্পিউটার প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ড্রাইভিং সিম্যুলেটর উন্নয়ন করা হয়েছে। কম্পিউটার সিম্যুলেশনের মাধ্যমে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের জন্য চালককে একটি নির্দিষ্ট আসনে বসতে হয়। চালকের মাথায় পরিহিত হেড মাউন্ডেড ডিসপ্লে সাহায্যে কম্পিউটার দ্বারা সৃষ্টি যানবাহনের অভ্যন্তরীণ অংশ এবং আশপাশের রাস্তায় পরিবেশের একটি মডেল দেখানো হয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি হেড ট্রাকিং সিস্টেম। ফলে, ব্যবহারকারী যানবাহনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অংশের ৩৬০হ্ন ডিগ্রি দর্শন লাভ করেন এবং কম্পিউটারসৃষ্ট পরিবেশে মগ্ন থাকেন।

গ) সামরিক বাহিনীতে: সামরিক বাহিনীতে অনেক বছর ধরে মিলিটারি প্রশিক্ষণে ফ্লাইট সিম্যুলেটর ব্যবহূত হয়ে আসছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহার করে প্রচলিত ফ্লাইট সিম্যুলেটরের আরও উন্নতি সাধন করা সম্ভব। এ ছাড়া ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে সিমুলেটেড ওয়ার দ্বারা সেনাদের অনেক বেশি বাস্তব ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে।

ঘ) ব্যবসা-বাণিজ্যে: ব্যবসা-বাণিজ্যেও ভার্চুয়াল রিয়েলিটির ব্যবহার করে তথ্য ও যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও সহজ করা সম্ভব। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ব্যবহারকারীকে ফাইল কেবিনেট দিয়ে কম্পিউটারের ডেক্সটপে তথ্য খুঁজতে হবে না; বরং ব্যবহারকারী নিজেই ফাইল ড্রয়ার খুলতে পারবে এবং নিজের হাতে ফাইলগুলো সাজাতে পারবে।

ঙ) বিনোদনে: ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবাস্তব সব দৃশ্যকে বাস্তব দৃশ্যে পরিণত করা যায়। টাইটানিক, সিন্দাবাদ, স্পাইডারম্যান ইত্যাদি সব ছবিতে যেসব আশ্চর্য দৃশ্য দেখানো হয়েছে তা সবই ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে বাস্তব সম্মত করে দেখানো হয়েছে।

২. নেতিবাচক প্রভাব

ক) ব্যয় বৃদ্ধি: ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সরঞ্জামাদির চড়া দাম ও জটিলতা হচ্ছে বর্তমানে বিজ্ঞানীর প্রধান দুটি সমস্যা।

খ) অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর: বর্তমান সমাজের মনুষ্যত্বহীনতা ইস্যুটি হচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির আরও একটি নেতিবাচক দিক। পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের মনুষ্যত্ব ধরে রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে যেন আমরা প্রযুক্তি দ্বারা পরিচালিত না হই। কিন্তু যদি বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী ভার্চুয়াল রিয়েলিটি বিস্তৃতি লাভ করে, তাহলে মানুষের পারস্পারিক ক্রিয়া উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। কারণ, মানুষ তখন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি দ্বারা বাস্তব জীবনের চেয়েও অনেক ভালো বন্ধু এবং মনের মতো পরিবেশ পাবে। আর মানুষ যদি এভাবে কালো চশমা আর গ্লাভসকে মানুষ ও সমাজের বিকল্প হিসেবে বেছে নেয়, তাহলে মানবসমাজ বিলুপ্ত হতে আর বেশি সময় লাগবে না।

গ) কল্পনানির্ভর: ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে মানুষ তার কল্পনার রাজ্যে ইচ্ছেমতো বিচরণ করতে পারে। ফলে, দেখা যাবে যে বেশির ভাগ সময় কাটাবে কল্পনার জগতে এবং খুব কম সময় থাকবে বাস্তব জগতে। কিন্তু এভাবে যদি মানুষ কল্পনা ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে না পারে তাহলে এই পৃথিবী চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হবে।

ঘ) স্বাস্থ্যের ক্ষতি: এ ছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে যে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও হানিকর। এটি মানুষের দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির ক্ষতি সাধন করে।

No comments:

Post a Comment