বায়োমেট্রিক্স (Biometrics)

বায়োমেট্রিক্স হলো বায়োলজিক্যাল ডেটা পরিমাপ এবং বিশ্লেষণ করার প্রযুক্তি। গ্রীক শব্দ “bio” যার অর্থ Life বা প্রাণ ও  “metric” যার অর্থ পরিমাপ করা।

বায়োমেট্রিক্স হলো এমন একটি প্রযুক্তি যেখানে কোন ব্যক্তির দেহের গঠন এবং আচরণগত বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে তাকে অদ্বিতীয়ভাবে চিহ্নিত বা নাক্ত করা যায়।

মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য সনাক্ত করতে বায়োমেট্রিক্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। প্রত্যেক মানুষ অন্য মানুষ অপেক্ষা বৈশিষ্ট্যগতভাবে আলাদা।

বায়োমেট্রিক্স-এর ব্যবহার/কাজ:

ক. ব্যক্তি সনাক্তকরণ: বায়োমেট্রিক্স পদ্ধতিতে মানুষের কোন অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে তাকে সনাক্ত করা হয়।
খ. ব্যক্তির সত্যাসত্য নিশ্চায়ণ: এই পদ্ধতিতে পূর্ব থেকেই কেন্দ্রীয়ভাবে ডেটাবেজে সংরক্ষিত মানুষের কোন অদ্বিতীয় এক বা একাধিক বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে পরীক্ষাধীন ব্যক্তির বর্তমান বায়োমেট্রিক ডেটার তুলনা করে ঐ ব্যক্তির সত্যাসত্য নিশ্চায়ন করা হয়।

বায়োমেট্রিক্স সিস্টেমে সনাক্তকরণে বিবেচিত বায়োলজিক্যাল ডেটা গুলিকে  মূলত ২ ভাগে ভাগ করা হয়-
    
     1. শারীরিক 
          2. আচরণগত



১. ফেইস রিকোগনিশন:
মুখ বা চেহারার বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিকে সনাক্ত করার পদ্ধতি হচ্ছে ফেইস রিকোগনিশন।
একজন মানুষের মুখমন্ডলের সাথে অন্য কোন মানুষের মুখমন্ডলের হুবহু মিল দেখা যায় না ফেইস রিকোগনিশন সিস্টেম হচ্ছে এক ধরনের কম্পিউটার প্রোগ্রাম যার সাহায্যে মানুষের মুখের গঠন প্রকৃতি পরীক্ষা করে তাকে সনাক্ত করা হয়।

এই পদ্ধতিতে কোন ব্যবহারকারীর মুখের ছবিকে কম্পিউটারে সংরক্ষিত ছবির সাথে দুই চোখের মধ্যবর্তী দূরত্বনাকের দৈর্ঘ্য ও ব্যাসচোয়ালের কৌণিক পরিমাণ ইত্যাদি পরিমাপের মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে সনাক্ত করা হয়।


ব্যবহার:
    •       সন্দেহভাজন কোন ব্যক্তিকে সনাক্তকরণে
    •       বিল্ডিং বা কক্ষের প্রবেশদ্বারে পাহারা দেয়ার কাজে
    •       কোন ব্যক্তির আইডি নম্বর সনাক্তকরণে


সুবিধা:
Ø  সহজে ব্যবহারযোগ্য
Ø  সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়

অসুবিধা:
  Ø ক্যামেরা ছাড়া এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায় না এবং আলোর পার্থক্যের কারণে জটিলতার সৃষ্টি হয়।
   Ø মেকআপ ব্যবহারগহনা ব্যবহার, চুলের স্টাইলের পরিবর্তন ইত্যাদির কারণে অনেক সময় সনাক্তকরণে সমস্যা হয়।

২. ফিঙ্গার প্রিন্ট:
একজনের আঙ্গুলের ছাপ বা টিপসই অন্য কোন মানুষের আঙ্গুলের ছাপ বা টিপসইয়ের সাথে মিল নেই। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমেই আঙ্গুলের ছাপ ডেটাবেজে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরবর্তীতে ফিঙ্গার প্রিন্ট রিডার এর মাধ্যমে আঙ্গুলের ছাপ ইনপুট নিয়ে ডেটাবেজে সংরক্ষিত আঙ্গুলের ছাপের সাথে তুলনা করে কোন ব্যাক্তিকে চিহ্নিত করা হয়।

ফিঙ্গার প্রিন্ট রিডার হচ্ছে বহুল ব্যবহৃত একটি বায়োমেট্রিক ডিভাইস যার সাহায্যে মানুষের আঙ্গুলের ছাপ বা টিপসই এগুলিকে ইনপুট হিসাবে গ্রহণ করে তা পূর্ব থেকে সংরক্ষিত আঙ্গুলের ছাপ বা টিপসইয়ের সাথে মিলিয়ে পরীক্ষা করা হয় ।
ব্যবহার: 
১। কোন প্রোগ্রাম বা ওয়েবসাইটে ইউজার নেইম এবং পাসওয়ার্ডের পরিবর্তে আঙ্গুলের ছাপ ব্যবহার করা হয়
২। কোন সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ।
৩। ব্যাংকিং পেমেন্ট সিস্টেমে।
৪। ডিএনএ সনাক্ত করার কাজে।
৫। আদালতে সাক্ষ্য প্রমাণের কাজে।
সুবিধা:
১। খরচ তুলনামূলক কম।
২। সনাক্তকরণের জন্য সময় কম লাগে।
৩। সফলতার পরিমাণ প্রায় শতভাগ।
অসুবিধা:
১। শুষ্কতা, ময়লা, কেটে গেলে বা কোন প্রকার আস্তর লাগানো থাকলে ব্যক্তি সনাক্তকরণে সমস্যা হয়।
২। ছোট বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নয়।
৩. হ্যান্ড জিওমিট্রি:
প্রতিটি মানুষের হাতের আকৃতি ও জ্যামিতিক গঠনেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বায়োমেট্রিক ডিভাইস দ্বারা হ্যান্ড জিওমিট্রি পদ্ধতিতে মানুষের হাতের আকৃতি বা জ্যামিতিক গঠন ও হাতের সাইজ ইত্যাদি নির্ণয়ের মাধ্যমে মানুষকে সনাক্ত করা হয়। এই পদ্ধতিতে  হ্যান্ড জিওমেট্রি  রিডার হাতের দৈর্ঘ্যপ্রস্থপূরুত্ব ইত্যাদি পরিমাপ করে  ডেটাবেজে সংরক্ষিত হ্যান্ড জিওমেট্রির সাথে তুলনা করে ব্যক্তি সনাক্ত করে ।



ব্যবহার:
১। এয়ারপোর্টের আগমন-নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ।
২। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরীজীবীদের উপস্থিতি নির্ণয়ে
৩। বিল্ডিং বা কক্ষের প্রবেশদ্বারে।
। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং লাইব্রেরিতে।
৫। আদালতে আসামী সনাক্তকরণে।

সুবিধা: 
১। ব্যবহার করা সহজ।
২। সিস্টেমে অল্প মেমোরির প্রয়োজন।

অসুবিধা: 
১। ডিভাইস গুলোর দাম তুলনামূলক বেশি এবং ইনস্টলেশন খরচও বেশি।
২। ফিংগার প্রিন্ট এর চেয়ে ফলাফলের সূক্ষ্মতা কম।

৪. চোখের মনি এবং রেটিনা স্ক্যান: 
বায়োমেট্রিক্স প্রযুক্তিতে সনাক্তকরনের জন্য চোখের আইরিসকে আদর্শ অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। একজন ব্যক্তির চোখের আইরিস এর সাথে অন্য ব্যক্তির চোখের আইরিস এর প্যাটার্ন মিলবে না। 

আইরিশ সনাক্তকরণ পদ্ধতিতে চোখের চারিপার্শ্বে বেষ্টিত রঙিন বলয় বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা করা হয় এবং রেটিনা স্কান পদ্ধতিতে চোখের পিছনের অক্ষিপটের মাপ ও রক্তের লেয়ারের পরিমাণ বিশ্লেষণ ও পরিমাপ করা হয়। উভয় পদ্ধতিতে চোখ ও মাথাকে স্থির করে একটি ডিভাইসের সামনে দাড়াতে হয়।

ব্যবহার: 
১। এই পদ্ধতির প্রয়োগে পাসপোর্টবিহীন এক দেশের সীমা অতিক্রম করে অন্য দেশে গমন করা যেতে পারে যা বর্তমানে ইউরোপে ব্যবহত হচ্ছে।
২। এছাড়া সরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানমিলিটারিআর্থিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতেও সনাক্তকরণ কাজে ব্যবহার করা হয়।

সুবিধা:
১। সনাক্তকরণে খুবই কম সময় লাগে।
২। সনাক্তকরণে ফলাফলের সূক্ষ্মতা তুলনামুলকভাবে অনেক বেশি।
৩। এটি একটি উচ্চ নিরাপত্তামূলক সনাক্তকরণ ব্যবস্থা যা স্থায়ী।

অসুবিধা: 
১। এই পদ্ধতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
২। তুলনামূলকভাবে বেশি মেমোরি প্রয়োজন।
৩। ডিভাইস ব্যবহারের সময় চশমা খোলার প্রয়োজন হয়।

৫. ডিএনএ: 
মানুষের আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে যেমন আসল ও নকল মানুষ চেনা যাণ তেমনি ডিএনএ ফিংগার প্রিন্টিং এর সাহায্যেও আসল ও নকল মানুষ চেনা যায়। বস্তুত ডিএনএ ফিংগার প্রিন্টিং এর সাহায্যে মানুষ চেনার বিষয়টি অনেক বেশি বিজ্ঞান সম্মত। 

কোন মানুষের দেহ কোষ থেকে ডিএনএ আহরণ করার পর তার সাহায্যেই কতিপয় পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি অনুসারে ঐ মানুষের ডিএনএ ফিংগার প্রিন্ট তৈরি করা হয়। মানব দেহের রক্তচুলএকবার বা দুবার পরা জামা কাপড় থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা।

ব্যবহার:
১। অপরাধী সনাক্তকরণে
২। পিতৃত্ব নির্ণয়ে
৩। বিকৃত মৃতদেহ শনাক্তকরণে
৪। লুপ্তপ্রায় প্রাণীদের বংশ বৃদ্ধির জন্য জিনগত মিল রয়েছে এমন আত্মীয় খুঁজতে
৫। চিকিৎসা বিজ্ঞানে

সুবিধা:
১। পদ্ধতিগত কোন ভূল না থাকলে সনাক্তকরণের সফলতার পরিমাণ প্রায় শতভাগ।

অসুবিধা:
১। ডিএনএ ফিংগার প্রিন্টিং তৈরি ও সনাক্তকরণের জন্য কিছু সময় লাগে।
২। ডিএনএ প্রফাইলিং করার সময় পদ্ধতিগত ভূল ডিএনএ ফিংগার প্রিন্টিং এর ভূলের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
৩। সহোদর যমজদের ক্ষেত্রে ডিএনএ ফিংগার প্রিন্টিং সম্পূর্ণ এক হয়।
৪। তুলনামূলক খরচ বেশি।

আচরণগত বৈশিষ্ট্যের বায়োমেট্রিক্স:

১. ভয়েস রিকোগনিশন: 
বিভিন্ন মানুষের কণ্ঠস্বর বা ভয়েসের মধ্যে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। ভয়েস রিকোগনিশন পদ্ধতিতে সকল ব্যবহারকারীর কন্ঠকেকম্পিউটার প্রোগ্রামিং এর সাহায্যে ইলেক্ট্রিক সিগন্যালে রুপান্তর করে প্রথমে ডেটাবেজে সংরক্ষণ করতে হয় এবং একজন ব্যবহারকারীর কণ্ঠকে ডেটাবেজে সংরক্ষিত ভয়েস ডেটা ফাইলের সাথে তুলনা করে কোন ব্যক্তিকে নাক্ত করা হয়।

ব্যবহার:
। অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।
। টেলিফোনের মাধ্যমে লেনদেনের ক্ষেত্রে ভয়েস রিকোগনিশন সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
। টেলিকমিউনিকেশন সিস্টমের নিরাপত্তায়।
৪। বড় ধরনের প্রতিষ্ঠান টাইম এবং উপস্থিতি নির্ণয়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে।

সুবিধা:
। সহজ ও কম খরচে বাস্তবায়নযোগ্য সনাক্তকরণ পদ্ধতি।

অসুবিধা:
। অসুস্থতা জনিত কারণ যেমন: ঠান্ডা, সর্দি, কাশি ইত্যাদি কারণে কোন ব্যবহারকারীর কন্ঠ পরিবর্তন হলে সেক্ষেত্রে অনেক সময় সঠিক ফলাফল পাওয়া যায় না।
। সূক্ষ্মতা তুলনামূলকভাবে কম।
৩। কম্পিউটার বা ভয়েস রেকর্ডার ব্যবহার করে কণ্ঠস্বর নকল করা যায়; ফলে এই পদ্ধতি নিরাপদ নয়।

২. সিগনেচার ভেরিফিকেশন:
সিগনেচার ভেরিফিকেশন পদ্ধতিতে হাতে লেখা স্বাক্ষরকে পরীক্ষা করা হয়। 

এই পদ্ধতিতে স্বাক্ষরের আকারলেখার গতিলেখার সময় এবং কলমের চাপকে পরীক্ষা করে ব্যবহারকারীর স্বাক্ষর সনাক্ত করা হয়। একটি স্বাক্ষরের সকল প্যারামিটার ডুপ্লিকেট করা সম্ভব নয়। এই পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ ধরণের একটি কলম এবং প্যাড বা ট্যাবলেট পিসি ।

ব্যবহার: 
। ব্যাংক-বীমা, সরকারি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে স্বাক্ষর সনাক্তকরণের কাজে এই পদ্ধতি ব্যবহার হয়ে থাকে।

সুবিধা:
। ইহা একটি সর্বস্থরের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি ।
। এই পদ্ধতি ব্যবহারে খরচ কম।
। সনাক্তকরণে কম সময় লাগে।
অসুবিধা:
। যারা স্বাক্ষর জানে না তাদের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় না।

৩. টাইপিং স্ট্রোক:
এ পদ্ধতিতে কী বোর্ড বা কী বোর্দ সদৃশ কোন ইনপুট ডিভাইসে তার গোপনীয় কোড কত দৃউত টাইপ করে দিতে পারে তা সময় পূর্বের সময়ের সাথে মিলিয়ে কোনো ব্যক্তিকে সনাক্ত করা যায়

বায়োমেট্রিক্স ব্যবহারের ক্ষেত্রসমূহ:
। প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ
। অফিসের সময় ও উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
। পাসপোর্ট তৈরি
। ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি
। ব্যাংকের লেনদেন নিরাপত্তা
। ATM বুথে নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ
। আবাসিক নিরাপত্তা নিয়ন্তণ
। কম্পিউটার ডাটাবেজ নিয়ন্ত্রণ


No comments:

Post a Comment